মোহাম্মদ হাসান পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে রাঙামাটিতে কর্মরত
আছেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর পিতার নাম নুর মোহাম্মদ এবং মাতার নাম ফরিদা
বেগম। তাঁর ঠিকানা চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকা। জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি
নিজের নাম, জন্মতারিখ, বাবা ও মায়ের নাম সংশোধনের (পরিবর্তন) জন্য আবেদন
করেছেন। সন্দেহ দেখা দেওয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য চট্টগ্রাম জেলা
নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাঁর আবেদনটি ঢাকায় নির্বাচন কমিশন
সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, গত
বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল
সংশোধনের জন্য চট্টগ্রাম জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৩০ হাজার
বাসিন্দা আবেদন করেছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার ৬৪৮ জনের
আবেদন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, তাঁরা জাতীয় পরিচয়পত্রের মৌলিক
তথ্যের পরিবর্তন চান।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল
লতিফ শেখ বলেন, পুলিশ কনস্টেবল মোহাম্মদ হাসান তাঁর নাম পরিবর্তন করে মো.
আলী মোক্তার, বাবার নাম নুর মোহাম্মদ পরিবর্তন করে মোহাম্মদ শাহ, মায়ের নাম
ফরিদা বেগম পরিবর্তন করে ফরিদা শেখ এবং জন্মতারিখ পয়লা জানুয়ারি ১৯৮৮
সালের পরিবর্তে ১৭ এপ্রিল ১৯৯৪ সাল করতে আবেদন করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে
অনেকের তথ্যগত ভুল হয়েছে। কিন্তু নিজের নাম, বাবা ও মায়ের নাম এবং
জন্মতারিখ পাল্টানোর আবেদন করেছেন তিনি। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ছাড়া অন্য
কারও পক্ষে এর ফয়সালা করা সম্ভব নয়।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথম আলোকে
মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমি জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিবর্তন
চেয়েছি। ভোটার তালিকা করার সময় এসব ভুল হয়েছে।’ বাবা, মা এবং নিজের
জন্মতারিখ সব একসঙ্গে কীভাবে ভুল হলো, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আসলে তখন
বুঝিনি।’ তিনি বলেন, মো. আলী মোক্তার তাঁর প্রকৃত নাম। এই নামেই ২০১৩ সালে
পুলিশের চাকরিতে প্রবেশ করেন তিনি। পরিচয়পত্র সংশোধনীর জন্য ২০১৫ সালের
অক্টোবরে তিনি আবেদন করেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে
বলেন, বাবা-মা, নিজের নাম, জন্মতারিখ পরিবর্তনের (সংশোধন) জন্য যাঁরা
আবেদন করেছেন, তাঁদের অনেকের করা আবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
উঠেছে।
আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের
পাহাড়তলীর বাসিন্দা এ কে এম বশির আহমেদ তাঁর বাবা ও মায়ের নাম পরিবর্তন
চেয়ে সম্প্রতি আবেদন করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর বাবার নাম ছালেহ আহমেদ
পরিবর্তন করে মৃত আবদুল হান্নান করতে চাচ্ছেন। একইভাবে মায়ের নাম ছাহেরা
বেগম পরিবর্তন করে মৃত জোবেদা খাতুন করতে চাচ্ছেন। তাঁর এই আবেদন নিয়েও
নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের থানা নির্বাচন কর্মকর্তা জাকিয়া হোসনাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ কে এম বশির আহমেদের বাবা ও মায়ের নাম পরিবর্তন বিষয়ে করা আবেদনটি আমরা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠিয়ে দেব।’
বাবা ও মায়ের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে এ কে এম বশির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, শেখ আলী জামান
নামের একজন কারারক্ষী নিজের এবং বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করার জন্য আবেদন
করেছেন। তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম
কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী হিসেবে কর্মরত আছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের থানা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখ প্রথম আলোকে
বলেন, ‘শেখ জামান আলী নিজের নাম মো. আলী হোসেন, বাবার নাম আবদুস সালামের
স্থলে সৈয়দ হোসেন এবং মায়ের নাম সৈয়দা মমতা হেনার স্থলে মিনা আক্তার করতে
আবেদন করেছেন। এটিও বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তনবিষয়ক আবেদন। এই আবেদনপত্র
নিয়েও আমাদের সন্দেহ আছে। বিষয়টির ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন
কমিশন সচিবালয়ের।’
যোগাযোগ করা হলে শেখ আলী জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র করার সময় এর গুরুত্ব বুঝিনি। তখন ভুল হয়ে গেছে। এখন সংশোধনীর জন্য আবেদন করেছি।’
আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রফিক
আহমেদ ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে এসএসসি পাস করেন, পাসের সনদে তাঁর
জন্মতারিখ ১৯৫৯ সালের ৩ মে উল্লেখ রয়েছে। তিনি জন্মতারিখ ১৯৬৯ সালের ৩
এপ্রিল করতে আবেদন করেছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখ প্রথম আলোকে
বলেন, রফিক আহমেদের মাধ্যমিক সনদ ঠিক আছে। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ৩ এপ্রিল যদি
তাঁর জন্ম হয়, তাহলে পাঁচ বছরে কি মাধ্যমিক পাস করা সম্ভব? তাঁর আবেদনটি
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নাকচ করে দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে রফিক আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সুলতান
হাওলাদার নামের এক ব্যক্তির জন্ম ১৯৪৩ সালের ২১ মে। বয়স কমিয়ে তিনি
জন্মতারিখ ১৯৬৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি করতে আবেদন করেছেন। তিনি চট্টগ্রামের
বায়েজিদ এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী
মো. ওসমান গনির জন্ম ১৯৪১ সালের ৫ জুলাই। তিনিও বয়স কমিয়ে জন্মতারিখ ১৯৬৩
সালের ৩০ সেপ্টেম্বর করতে আবেদন করেছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার ওই দুই বাসিন্দার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ওই দুজনের করা আবেদনের বিষয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল
লতিফ শেখ বলেন, ‘তাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বাস্তবতার সঙ্গে বয়স কমানোর
আবেদনের কোনো মিল নেই। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে দু-চার বছর পর্যন্ত বয়স
কমানোর আবেদন বিবেচনা করা যায়। ২০-২৫ বছর বয়স কমানোর যৌক্তিকতা কী?’
No comments:
Post a Comment