Sunday, December 11, 2016

রেমিট্যান্সে বিপর্যয় : তিন মাসে কমেছে ৫,৪৬৮ কোটি টাকা

গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছিল ১৩৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এসেছে ১০৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার; আগের বছরের তুলনায় যা ৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলার কম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বর নয়, একই চিত্র অর্থবছরের পুরো প্রথম প্রান্তিকের।
১৯৯৮ সালে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে একটি এক্সচেঞ্জ হাউজ দেশে কার্যরত একটি বিদেশী ব্যাংকের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। সে সময় প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ওই বিদেশী ব্যাংকটি বাংলাদেশী টাকায় গ্রাহকদের পরিশোধ করে, যার কারণে ওই বছর সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ৪০ শতাংশ কমে যায়। বর্তমানেও এমন কোনো জালিয়াতি ঘটছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) দেশে মোট ৩৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে ৩২৩ কোটি ২১ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থের অংকে তা ৭০ কোটি ১৫ লাখ ডলার বা ৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ( প্রতি ডলার ৭৭ টাকা ৯৫ পয়সা)।
বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য অশুভ ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএ তসলিম বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশে থাকা তাদের আত্মীয়স্বজন খরচ করে, যার কারণে বাজারে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু প্রবাসীরা অর্থ কম পাঠালে দেশে থাকা স্বজনদের আয় কমবে। ফলে তারা খরচও কম করবে। এতে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। তবে রেমিট্যান্স সরাসরি জিডিপির অংশ নয়। রেমিট্যান্স কম আসার ক্ষতি অন্য খাতের প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে হবে। তা না হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।
সূত্রমতে, সত্তরের দশক থেকে দেশের শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ বিদেশমুখী হয়। নব্বইয়ের দশকে বিদেশে যাওয়ার পালে হাওয়া লাগে। এ সময়ে বিপুলসংখ্যক দক্ষ-অদক্ষ জনশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তর উত্স হিসেবে স্থান করে নেয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।
স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাওয়া রেমিট্যান্স প্রথমবারের মতো ধাক্কা খায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। এর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবারো কমে যায়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১ হাজার ৯৮ কোটি ৭৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে এ অর্থের পরিমাণ ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৪৬ কোটি ১১ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৩ কোটি ২৮ লাখ ডলার কমে ১ হাজার ৪২২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলারে নেমে আসে। রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রবাহ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। চলতি বছরের আগস্টে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে রেমিট্যান্স আসে ৬৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রায় ১০ কোটি ডলার কমে ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আশঙ্কাজনক হারে রেমিট্যান্স কমেছে দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। আগস্টে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স আসে ২৩ কোটি ৯ লাখ ডলার। অথচ সেপ্টেম্বরে এসেছে ১৭ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এক মাসে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স কমেছে ৫ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। একইভাবে আগস্টে আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স আসে ২০ কোটি ১২ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে তা ১৬ কোটি ৯২ লাখ ডলারে নেমে আসে।
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪ কোটি ৭৪ লাখ, মালয়েশিয়া থেকে ৯ কোটি ৩৩ লাখ, কুয়েত থেকে ৭ কোটি ৮৩ লাখ, ওমান থেকে ৭ কোটি ৯৬ লাখ, যুক্তরাজ্য থেকে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ও ইতালি থেকে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বরাবরের মতো সেপ্টেম্বরেও সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংকটির মাধ্যমে আগস্টে দেশে এসেছে ২৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার। রেমিট্যান্স আহরণে এর পরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। আগস্টে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসে ১১ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ৯ কোটি ৩০ লাখ ও জনতা ব্যাংক ৮ কোটি ৩১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করেছে। দেশের বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক ৪ কোটি ৬৭ লাখ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ৫৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৫০টির মাধ্যমে দেশে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, ঈদের মাসেও দেশে প্রবাসী আয় কমে যাওয়া অবশ্যই উদ্বেগ ও আশঙ্কার কথা। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রধান শ্রমবাজার। এসব দেশে কর্মরত প্রবাসীরা অর্থ জমা করে রাখেন না। মধ্যপ্রাচ্যে থেকে প্রবাসী আয় কমে যাওয়া সেসব দেশে কর্মরত শ্রমিকদের সংকট ও দুর্দশার কথাই জানান দিচ্ছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, লিবিয়া, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব দেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা গেলে আমাদের বেকার সমস্যার সমাধানও হতো, একই সঙ্গে রেমিট্যান্সও বাড়ত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদেশ সফর করা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার করণেই নতুন শ্রমবাজার তৈরি এবং বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রেমিট্যান্সের নেতিবাচক প্রবাহের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের তিন মাসে রেমিট্যান্স কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, তেলের দাম কমে যাওয়া, যুক্তরাজ্যের মুদ্রার মান পড়ে যাওয়া, টাকার বিপরীতে বিদেশী মুদ্রার মান কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ দেশে কমেছে বলেই মনে হয়। এছাড়া রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়ে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

No comments:

Post a Comment

যুবলীগ থেকে বহিষ্কার হলেন সম্রাট-আরমান

অসামাজিক কার্যকলাপ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে যুব...