মেরী ক্যাসিলিয়া রজার্স একজন অতি সুন্দরী এবং আকর্ষণীয় মহিলা ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার লাশ ১৮৪১ সালের ২৮ শে জুলাই হাডসন নদীর তীরে তার লাশ পাওয়া যায়। ইতিহাসের পাতায় তার এই মৃত্যু আজও সবচেয়ে রহস্যময় হত্যাকান্ড হিসেবে টিকে আছে।
মেরী ক্যাসিলিয়া রজার্স ঠিক কবে জন্মগ্রহণ করেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। কারণ, তার জন্ম সংক্রান্ত কোন কাগজই সেসময় পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, খুব সম্ভবত তিনি ১৮২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম ছিল ফোবি রজার্স। মেরী রজার্সের বয়স যখন ১৭ বছর তখন মেরীর বাবা নৌকার ইঞ্জিন বিস্ফোরণে মারা যান। ফলে মেরীর পরিবার বেশ আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে যায়।
যার কারণে মেরী অর্থ উপার্জনের জন্য কাজের সন্ধান শুরু করতে বাধ্য হন। এবং খুব তাড়াতাড়ি একটা ছোটখাটো কাজ জোগাড়ও করে ফেলেন। নিউ ইয়র্কের একটা টোবাকো শপে ক্লার্ক হিসেবে চাকুরীজীবন শুরু হয় তার। টোবাকো শপটির মালিক ছিলেন জন আন্ডারসন নামের এক ধনাঢ্য ব্যাক্তি।
আন্ডারসন মেরীকে একটু বেশিই বেতন দিতেন। এর কারণ ছিল মেরী রজার্সের আকর্ষণীয় রূপ এবং দেহগঠণ। তার রূপের কারণে ক্রেতারা সহজেই আকৃষ্ট হতেন। তার সহকর্মীরা বলতেন, ক্রেতারা যতটা না সিগারেট কিনতে দোকানে আসে তার চেয়ে বেশি মানুষ মেরীকে দেখতে দোকানে আসতো।
এমনকি একজন ক্রেতা পরবর্তীতে সরাসরিই লিখেছেন, তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা দোকানটিতে যেতেন শুধু মেরীকে দেখতে। মেরীর ক্রেতাদের তালিকায় ওয়াশিংটন আর্ভেয়িং, জেমস ফেনিমোর কুপার এবং ফিটজ-গ্রীন হ্যালকের মত বিখ্যাত সাহিত্যিকদের নাম রয়েছে।
১৯৩৮ সালের ৫ অক্টোবর প্রথম মেরী রজার্স সংবাদপত্রের পাতায় আসেন। নিউইয়র্কভিত্তিক পত্রিকা “সান” মেরী রজার্সকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংবাদ প্রকাশ করে। এর পরদিনই “টাইমস এন্ড কমার্শিয়াল ইন্টিলিজেন্স” মেরী রজার্সের অন্তর্ধানের বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দেয় এবং মেরী রজার্স আসলে ব্রুকলিনে তার কোন এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করে।
এর কিছুদিন পরই এই খবরটির সত্যতা নিশ্চিত হয়। কিছুদিন পর মেরী রজার্স তার টোবাকো শপের চাকুরী ছেড়ে দেন। তখন গুজব শোনা গিয়েছিল, মেরী রজার্সের অন্তর্ধান এবং আবার ফিরে আসার পুরো ঘটনাটিতে জন আন্ডারসনের হাত রয়েছে।
এরপরের জীবনটা মোটামুটি স্বাভাবিকই ছিল। আবার সমস্যা শুরু হয় ২৫ শে জুলাই, ১৮৪১ সালে। এইদিনে মেরী তার বন্ধু দানিয়েল পাইনকে বলেন যে, তিনি তার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরতে যাচ্ছেন। দানিয়েলও ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই নেয়। এরপর থেকেই মেরী রজার্স নিখোজ।
অনেক চেষ্টার পরও খুজে না পেয়ে শেষমেষ পুলিশের সরনাপন্ন হয় মেরীর পরিবার। তিনদিন খোজাখুজির পর অবশেষে পুলিশ মেরী রজার্সের লাশ খুজে পায় নিউ জার্সির হাডসন নদীর তীরে। লাশের আলামত দেখে অনুমান করা হয় কেউ তাকে খুন করেছে। কিন্ত এর পেছনে কে থাকতে পারে?
পুলিশ অনেকগুলো মোটিভ খুজে পেলেও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ পায়নি কোন। তবে মেরীর খুনের সাথে তিন জনের নাম খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আসে। এক তার টোবাকো শপের মালিক জন আন্ডারসন, দ্বিতীয়জন, তার ছেলে বন্ধু দানিয়েল আর তৃতীয় আরেক ব্যাক্তি মাদাম র্যাসেল নামের এক ডাক্তার।
জনকে সন্দেহ করার কারণ হচ্ছে এক সময় জনের সাথে মেরীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার দোকানে দীর্ঘদিন কাজও করেছে। তার উপর মেরী ছিল দুর্দান্ত রকমের সুন্দরী। দানিয়েলকে সন্দেহ করার মত তেমন কোন কারণ না পাওয়া গেলেও পুলিশ কয়েক দফা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
মাদাম র্যাসেলকে সন্দেহ করার কারণ, মেরী সে সময় গর্ভবতী ছিলেন। মাদাম র্যাসেলের কাছে গিয়েছিলে গর্ভপাত করাতে। খুব সম্ভবত, সে সময় মাদাম র্যাসেল কিছু মারাত্মক ভুল করে ফেলায় মেরী মারা যায়। যদিও এর কোনটিই পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি। মেরী রজার্স খুন হওয়ার পর স্থানীয় পত্রিকাগুলি বেশ গুরুত্ব দিয়ে এই খুনের খবরটি প্রকাশ করেছিল।
মেরী রজার্সের মৃত্যুর মাত্র এক মাস পর তার ছেলে বন্ধু দানিয়েল আত্মহত্যা করে। তার সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, “To the World– here I am on the very spot. May God forgive me for my misspent life.”
জীবনের শেষ দিকে বেশ হতাশায় ভুগছিলেন দানিয়েল। কেন? অনেকরকম তত্ত্ব পাওয়া যায় এ ব্যাপারে। কেউ কেউ দাবি করেন মেরী রজার্সকে দানিয়েলই খুন করেছেন। পরে অনুশোচনায় আত্মহত্যা করেন। কিন্ত পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি কিছুই। মামলার আরও রহস্যময় ব্যাপার, মোটিভ ছিল অনেক। কিন্ত কোনটাকেই নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়ার উপায় ছিল না।
শেষ পর্যন্ত ১৯৪২ সালের শেষ দিকে পুলিশ এই কেইসে তদন্ত বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে আজ অবধি মেরী রজার্সের মৃত্যু আজও রহস্য হয়েই আছে। আর মেরী রজার্সের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে এডগার এলান পো লিখেছেন তার বিখ্যাত উপন্যাস “The Mystery of Marie Rogêt”.

No comments:
Post a Comment